আগামী ১০ই জিলহজ, বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আযহা তথা কোরবানির ঈদ। কুরবান শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো নৈকট্য অর্জন করা, কাছাকাছি যাওয়া। আর কোরবানির পারিভাষিক অর্থ হলো, কোনো জন্তু জবেহ করার মাধ্যমে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। কোরবানির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সামর্থ্যবান নর-নারীর উপর কোরবানি ওয়াজিব। এটি মৌলিক ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আদম আঃ থেকে সকল যুগে কোরবানি ছিল। তবে তা আদায়ের পন্থা এক ছিল না।
শরিয়তে মুহাম্মদির কোরবানি মিল্লাতে ইব্রাহিমের সুন্নত। সেখান থেকেই এসেছে এই কোরবানি। এটি শাআইরে ইসলাম তথা ইসলামের প্রতীকী বিধানাবলির অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এর মাধ্যমে শাআইরে ইসলামের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এছাড়া গরীব-দুঃখী ও পাড়া-প্রতিবেশীর আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়। আল্লাহ ও তাঁর রসুলের শর্তহীন আনুগত্যের শিক্ষা রয়েছে কোরবানিতে। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলার জন্য ত্যাগ ও বিসর্জনের ছবকও আছে এতে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়–ন এবং কোরবানি আদায় করুন। (সূরা কাউসার:২),
অন্য আয়াতে এসেছে- (হে রাসূল!) আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ (অর্থাৎ আমার সবকিছু) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য উৎসর্গিত। (সূরা আনআম : ১৬২),পশু জবাই করে কোরবানি করার মধ্যে এই হিকমত ও ছবকও আছে যে, আল্লাহর মুহববতে নিজের সকল অবৈধ চাহিদা ও পশুত্বকে কোরবানি করা এবং ত্যাগ করা।
সুতরাং কোরবানি থেকে কুপ্রবৃত্তির দমনের জাযবা গ্রহণ করা উচিত। তাই কোরবানির মধ্যে ইবাদতের মূল বিষয় তো আছেই, সেই সাথে তাকওয়ার অনুশীলনও রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- (মনে রেখো, কোরবানির জন্তুর) গোশ্ত অথবা রক্ত আল্লাহর কাছে কখনোই পৌঁছে না; বরং তাঁর কাছে কেবল তোমাদের পরহেযগারীই (তাকওয়া) পৌঁছে। (সূরা হজ : ৩৭),
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্য থেকে পশু কোরবানি করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহ তাআলার নিকট অধিক প্রিয় নয়। কেয়ামতের দিন এই কোরবানি করা পশুকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহ তাআলার নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি কর। (জামে তিরমিযী, হাদিস : ১৪৯৩),
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না তার ব্যাপারে হাদিস শরিফে কঠোর ধমকি এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যার কোরবানির সামর্থ্য আছে তবুও সে কোরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’(মুসনাদে আহমদ- ২/৩২১) অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে।
হজরত জায়েদ ইবনে আকরাম বলেন, “সাহাবায়ে কেরাম নবী করিম (সাঃ)-এর কাছে জিজ্ঞেস করেন, কোরবানি কী? নবী করিম (সাঃ) বলেন, ‘কোরবানি হলো তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আঃ) এর সুন্নত।’
এতে আমাদের সওয়াব কী? নবী করিম (সাঃ) বলেন, ‘কোরবানির পশুর প্রত্যেকটি পশমের বদলায় একটি করে সওয়াব রয়েছে।’ ভেড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ভেড়ার প্রত্যেকটি পশমের বদলায়ও একটি করে সওয়াব রয়েছে” (মুসনাদে আহমাদ)।
সুতরাং ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরিয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী সম্পাদন করা।
যাহার উপর কোরবানি ওয়াজিব ঃ প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর, ১০ যিলহজ্জ ফজর থেকে ১২ যিলহজ্জ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজন-অতিরিক্ত ঋণ ব্যতীত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রুপা, অলংকার, বর্তমানে বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যাবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। আর নিসাব হলো স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হল সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রুপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব। যেমন কারো নিকট কিছু স্বর্ণ ও কিছু টাকা আছে, যা সর্বমোট সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্য সমান হয় তাহলে তার উপরও কোরবানি ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়–ন এবং কোরবানি আদায় করুন। (সূরা কাউসার : ২)
একান্নভুক্ত পরিবারের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাওয়া গেলে অর্থাৎ তাদের কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে তাদের প্রত্যেকের উপর ভিন্ন ভিন্ন কোরবানি ওয়াজিব। পরিবারের যত সদস্যের উপর কোরবানি ওয়াজিব তাদের প্রত্যেককেই একটি করে পশু কোরবানি করতে হবে কিংবা বড় পশুতে পৃথক পৃথক অংশ নিতে হবে। একটি কোরবানি সকলের জন্য যথেষ্ট হবে না। কোরবানির নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কোরবানির তিন দিন থাকলে এমনকি ১২ তারিখ সূর্যাস্তের কিছু আগে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে গেলেও কোরবানির ওয়াজিব হবে। নাবালক শিশু-কিশোর তদ্রুপ যে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে নফল কোরবানি করতে পারবে। যে ব্যক্তি কোরবানির দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই এমন দরিদ্র ব্যক্তির উপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মোট তিন দিন কোরবানির সময়। তবে সবচেয়ে উত্তম হলো প্রথম দিন কোরবানি করা। এরপর দ্বিতীয় দিন এরপর তৃতীয় দিন। আল্লাহ তায়ালা সকলকে তাওফীক দান করুন, আমিন।
লেখক : প্রধান শিক্ষক, পশ্চিম বানিয়াখামার দারুল কুরআন বহুমুখী মাদ্রাসা।

